অ্যানিমেশন
অ্যানিমেশন

অ্যানিমেশন কী- কিভাবে অ্যানিমেশন তৈরি করবো

ছোট বেলা কার্টুন দেখে না বা দেখতে পছন্দ করে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। শুধু ছোটোরা পছন্দ করে এমন নয় বড়রা ও কার্টুন দেখে সুযোগ পেলেই। আমরা যখন ছোট ছিলাম আমাদের জন্য জনপ্রিয় কার্টুন ছিল মিনা রাজু, সিসিমপুর, টম এন্ড জেরী। এই সব কার্টুন দেখার জন্য আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। এই সব কার্টুন এর চরিত্রগুলো জড়িয়ে থাকত আমাদের কল্পনায়।। মিনা রাজুর কার্টুন ছিল শিক্ষনীয় কার্টুন। আর টম এন্ড হলো মজার একটি কার্টুন যা এখন পর্যন্ত অনেক জনপ্রিয়। বিড়াল টম এবং জেরী ইদুর এর খুনসুটি, ঝগড়া, ভালোবাসক দেখে আমাদের মন অনেক ভালো হয়ে যেত। তবে বর্তমান প্রজন্মের জন্য এখন আরও অনেক ভালো ভালো কার্টুন বের হয়েছে যেমন – শিবা, মটু-পাতলু, ছোটা ভিম, ডোরিমন ইত্যাদি আরও অনেক কার্টুন রয়েছে যা বাচ্চাদের অনেক প্রিয় কার্টুন।

এই সব কার্টুন দেখলে আমরা এক বার হলে চিন্তা করে থাকি যে কার্টুন গুলো কিভাবে তৈরি করে। আসলে এই কার্টুন ভিডিও গুলো হচ্ছে অ্যানিমেশন ভিডিও। এই কার্টুন বা অ্যানিমেশন নিয়ে চিন্তা করে অনেকেই কৌতুহলী হয়ে অ্যানিমেশন নিয়ে পড়াশোনা বা ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে চায়। বর্তমানে গ্রাফিক্স ডিজাইন সম্পর্কে শুনে নি বা জানে না এমন খুব কম মানুষই আছে। অ্যানিমেশন তৈরি করা আসলে গ্রাফিক্স ডিজাইন এরই একটি অংশ। এই অ্যানিমেশন যে শুধু কার্টুন বা বাচ্চাদের সিনেমা তৈরিতে ব্যবহার হয় এমন নয়। বর্তমানে বলিউড, হলিউড থেকে শুরু করে বিজ্ঞাপন জগতে ও অ্যানিমেশন বিভিন্ন ভূমিকা রাখছে এবং এর চাহিদা দিন দিন বেড়ে চলছে। বলতে গেলে এই শিল্পের চাহিদা
এখন অনেক উঁচু স্থানে। আবার এই অ্যানিমেশন কেরিয়ার গড়ার মাধ্যমে অনেক ভালো ইনকাম করা যায় বলে ও অনেকই এই পেশার দিকে ঝুঁকছে। অ্যানিমেশন নিয়ে কেরিয়ার গড়তে চাইলে আগে এর সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হবে। তাই এখন আমরা অ্যানিমেশন নিয়ে আলোচনা করব।

অ্যানিমেশন কী:
অ্যানিমেশন শব্দের বাংলা অর্থ সজীবতা। এই কথাটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘অ্যানিমা’ থেকে যার বাংলা অর্থ হলো আত্মা। কোন স্থীর চিত্র বা চরিত্র এঁকে তাকে জীবন্ত করে তোলার নামই হলো অ্যানিমেশন। সেই স্থীর চিত্র বা চরিত্রটি হতে পারে কোন মানুষ বা কোন জীব জন্তু বা হতে পারে পৃথিবীর যে কোন বস্তুর। অর্থাৎ কোন প্রানহীন বস্তু তে প্রান সঞ্চার করে তাকে জীবন্ত করে তোলা যা মানুষের বিনোদনের এক অনন্য সৃষ্টি।

আমাদের দেখা জনপ্রিয় কার্টুন মিনা রাজু থেকে শুরু করে বর্তমান জেনারেশন এর জনপ্রিয় কার্টুন শিবা থেকে ডোরিমন পর্যন্ত সবই অ্যানিমেশন এর বদৌলতে সৃষ্টি করা হয়েছে। ফিল্ম বিজ্ঞাপন এর কাজের ক্ষেত্রেও এই অ্যানিমেশন এখন প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে । বিশ্বের প্রথম অ্যানিমেশন ফিল্ম ‘Humorous Phases of Funny Faces’ যা ১৯০৬ সালে জে স্টুয়ার্ট ব্ল্যাকটন এর হাত ধরে দেখার সুযোগ হয়েছিল । সাধারণত অ্যানিমেশন দুই প্রকার একটি ২D এবং অন্যটি ৩D । আবার আর একধরণের অ্যানিমেশন আছে যা স্টপ মোশন বা ক্লে মোশন নামে পরিচিত । এটি করতে প্রথমে ক্লে দিয়ে বিভিন্ন মডেল তৈরি করে নিতে হয় তারপর বিভিন্ন এঙ্গেলে ফ্রেম বাই ফ্রেম ছবি তুলে করা হয় ।

২D অ্যানিমেশন কী ?
ক্লাসিক্যাল অ্যানিমেশন বা 2 ডায়মেনশনাল অ্যানিমেশন কে ২D ডি অ্যানিমেশন বলা হয় । হাতে আঁকা হল এর মূল ভিত্তি । ২D ডি অ্যানিমেশন এর প্রধান কাজ হল একটি ক্যারেক্টারের বিভিন্ন মুভমেন্ট গুলি একই ফ্রেমে এঁকে তারপর সে গুলি কে স্ক্যান করে সফটওয়ারের মাধ্যমে মোশন পিকচার তৈরি করা । বাচ্চাদের কাছে এই অ্যানিমেশন অতি প্রিয় ।এই শিল্পের মাধ্যমিই বেশিরভাগ কার্টুন ক্যারেক্টার গুলো তৈরি করা হয়েছে বা হয় । ২D ডি অ্যানিমেশনই হল মিনা রাজু, সিসিমপুর, টম এন্ড জেরী , ছোটা ভীম , মটু-পাতলু ইত্যাদি কার্টুন চরিত্রের মুল ভিত্তি । এডোবি ফটোশপ বা এডোব ইলস্ট্রটর সফটওয়্যার ব্যবহার হয় কার্টুন ক্যারেক্টার গুলো আঁকার জন্য । এডোবি এনিমেট সি সি , এডোবি ফ্ল্যাশ , এনিমেট ষ্টুডিও মোহো ইত্যাদি ব্যবহার হয় একে মুভমেন্ট করার জন্য । টুনবুম হারমোনি হল সবথেকে উচ্চমানের ২D অ্যানিমেশন সফটওয়্যার ।

৩D অ্যানিমেশন কী ?
৩ ডায়মেনশনাল অ্যানিমেশনই হলো ৩D অ্যানিমেশন । এই শিল্পের ব্যবহার বর্তমানে সবচেয়ে বেশি হয় । এই শিল্প সবথেকে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে বর্তমান সিনেমা এবং বিজ্ঞাপন জগতে । এই শিল্পের বদৌলতে স্রেক, কুংফু পান্ডা ইত্যাদি অ্যানিমেশন মুভি তৈরি হয়েছে । তুলনামূলক ভাবে এটি ২D অ্যানিমেশন এর থেকে কঠিন । ক্যারেক্টার ডিজাইন , ব্যাকগ্রাউন্ড ডিজাইন , ক্যারেক্টার মুভমেন্ট ইত্যাদি করতে অনেকটাই সময় ব্যায়
করতে হয়। এই অ্যানিমেশন তৈরি করতে চাইলে বিশেষভাবে দক্ষ হতে হয় । এই কারনে এর মূল্য অনেক বেশি । এই শিল্প তৈরি করার জন্য হাতে ছবি অঙ্কনের তেমন প্রয়োজন হয় না । কম্পিউটার বা সফটওয়্যার এর মাধ্যমেই বেশির ভাগ তৈরী হয় ।

এই শিল্পের তৈরীর জন্য ভিন্ন ভিন্ন অ্যানিমেটর লাগে । যেমন একজন ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যানিমেটর কাজ করে ব্যাকগ্রাউন্ড ডিজাইন করার জন্য । মডেলিং অ্যানিমেটর লাগে মডেলিং বা ক্যারেক্টার ডিজাইন করার জন্য । আবার লাইটিং , টেক্সটারিং এর জন্য আলাদা আলাদা অ্যানিমেটর কাজ করে । সবশেষে একজন রেন্ডারিং অ্যানিমেটর রেন্ডারিং , বিভিন্ন ইফেক্ট দেওয়ার কাজটি করে । এই শিল্পের তৈরীর করার জন্য অনেক অ্যানিমেটর এবং সময় লাগে তাই এই শিল্প ২D অ্যানিমেশন শিল্প থেকে অনেক বেশি জীবন্ত বলে মনে হয় । অনেক ভালো ভালো সফটওয়্যার আছে এই অ্যানিমেশন শিল্প এর জন্য । এগুলো হলো অটোডেক্স মায়া , ৩D ম্যাক্স , ইত্যাদি। সাধারণত এই সফটওয়্যার গুলো বেশি ব্যবহার হয়। অটোডেক্স মায়া , ৩D ম্যাক্স তুলনামুলক ভাবে শিখা একটু কঠিন কিন্তু সময় দিয়ে অনুশীলন করলে কিছুদিনের মধ্যে রপ্ত করা যায় । আবার একটি সফটওয়্যার আছে ব্লেন্ডার নামে যা কিনতে হয় না , ফ্রী ডাউনলোড করে ব্যবহার করতে পারবেন। এই ব্লেন্ডার সফটওয়্যার এর সুবিধা হলো একটু কম কন্ফিগার কম্পিউটারেও চলে অটোডেক্স মায়া ,৩D ম্যাক্স এর মতো হাই কন্ফিগার এর কম্পিউটার দরকার হয় না ।

( সিনেমা ৪D নামে বর্তমানে একটা সফটওয়্যার আছে যা দিয়ে অতি সহজে অ্যানিমেশন তৈরি করতে পারবেন । এখন আবার খুব দ্রুত অ্যানিমেশন করর জন্য কিছু প্রিমেড ৩D সফটওয়্যার পাওয়া যায় যেমন মুভিজু , আইক্লোন ইত্যাদি । তবে এই সফটওয়্যার গুলোর মধ্যে রয়েছে কিছু শীমাবধ্যতা । নিজের ইচ্ছা মতো সবকিছু যেমন ক্যারেক্টর ডিজাইন বা মুভমেন্ট ইত্যাদি করা যায় না । সফটওয়্যার এর মধ্যে কিছু ক্যারেক্টার দেওয়া থাকে সেগুলো দিয়ে কাজ করতে হয় । )

অ্যানিমেশন শিখতে যোগ্যতা :
অ্যানিমেশন শিখার জন্য আপনার বিশেষ কোন শিক্ষাগত যোগ্যতার দরকার হয় না কিন্তু ছবি সম্পর্কে আপনাকে সাধারণ কিছু ধারণা রাখতে হবে। একটি ছবির মুভমেন্ট হলে তা কেমন দেখতে হবে বিশেষ করে তার একটা ধারণা থাকলেই চলবে। আর ২D অ্যানিমেশন শিখতে চাইলে ছবি আঁকা সম্পর্কে ও ধারণা রাখতে হবে কারণ এটির মূল ভিত্তিই হলো ছবি আঁকা। এই শিল্প সাধারণত দুই ভাবে শিখা হয়ে থাকে এক ডিপ্লোমা এবং দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো ডিগ্রি। ডিপ্লোমা করলে তার মেয়াদ ৬ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত হয়। এর জন্য আপনাকে মাধ্যমিক পাশ হতে হবে। কিন্তু ৩ বছরের ডিগ্রি করতে চাইলে আপনাকে ১২ শ্রেণি উত্তীর্ণ হতে হবে।

অ্যানিমেশন কোর্সে কী কী শেখানো হয় ?
এই কোর্স করলে প্রথমে আপনাকে এই শিল্পের ইতিহাস ও বেসিক সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হবে। এরপর কিছু ব্যাসিক সফটওয়্যার যেমন ফটোশপ, ইলাস্ট্রেটর ইত্যাদি সম্পর্কে শেখানো হবে যা দ্বারা অ্যানিমেশন তৈরী করা হয়। তারপর আপনাকে স্ক্রিপ্ট লেখা,স্টোরি বোর্ড ,ক্যারেক্টার ডিজাইন , মডেলিং , রেন্ডারিং , লাইটিং ইত্যাদি শেখানো হবে । এছাড়াও বস্তুর রং , আকার , ভিসুয়ালাইজেশন , ব্যাকগ্রাউন্ড আর্ট , সাউন্ড এবং ভিডিও এডিটিং ইত্যাদি শেখানো হবে ।

কত আয় করতে পারবেন ?:
অনেকেই এই শিল্পের পে প্যাকেজ দেখে এই শিল্পের প্রতি আগ্রহী হয় যা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। কিন্তু একজন অ্যানিমেটর এর আয় নির্ভর করে তার দক্ষতা ও কাজের ধরনের উপর। প্রথমে একজন ট্রেনি অ্যানিমেটর হিসেবে যোগ হলে তার পে প্যাকেজ ৮ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। দক্ষতা অর্জনের সাথে সাথে একজন অ্যানিমেটর এর পে প্যাকেজ অনেক বেড়ে যায় । অর্থাৎ একজন অ্যানিমেটর মাসে
লক্ষ্যের উপরেও আয় করতে পারে যদি সে তার কাজে নিদারুণ দক্ষতা অর্জন করে।

কাজ কোথায় পাবেন :
অ্যানিমেশন এ দক্ষ এমন একজন মানুষের কাজের অভাব হয় না। অ্যানিমেটর দের কাজের জন্য সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি থেকে বিজ্ঞাপন ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক সুযোগ আছে । সাধারণত ব্যাকগ্রাউন ডিজাইন , ক্যারেক্টর ডিজাইন , লাইটিং , রেন্ডারিং ,ইফেক্ট ইত্যাদির কাজের জন্য একজন অ্যানিমেটর কাজ পায় । আবার চাইলে অনেকে স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারে । যেমন অনলাইনে ফ্রীলান্সার হিসাবে অনেক কাজ করতে পারবেন । ক্যারেক্টার ডিজাইন করে অনলাইনে নিজের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিক্রি করতে পারবেন । আবার ইউটিউব এ চ্যানেল তৈরি করে একটা কার্টুন সিরিজ করে গুগল এডসেন্সের মাধ্যমে অনেক টাকা ইনকাম করতে পারবেন ।

[ গুরুত্বপূর্ণ কথা : অনেকটাই ধর্য্যের ও অনেক সৃজনশীল কাজ হলো এই শিল্প । তাই এটি নিয়ে পড়াশোনা করে ভালো কিছু করার জন্য ধর্য্য এবং সৃজনশীল মন মানুষিকতা থাকতে হবে। কারণ শুধু মাত্র পে প্যাকেজ দেখে এই শিল্প শিখতে গেলে মাঝপথে এসে আটকে যাবেন। তাই এই বিষয় নিয়ে কেরিয়ার গড়তে চাইলে অবশ্যই এই সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রেখে এগুতে হবে। ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here