“একজন রাখালের সাথে করা একজন প্রধান বিচারপতির ওয়াদা”

সক্রেটিসের ছাত্র ছিলেন প্লেটো। প্লেটোর ছাত্র এ্যরিস্টটল। জ্ঞানের তিন বাতিঘর। ঠিক তেমনি ইমাম জাফর আস সাদেকের ছাত্র ছিলেন জাবির ইবনে হাইয়ান, ইমাম আবু হানিফা আর ইমাম আবু হানিফার ছাত্র ছিলেন আবু ইউসুফ। জ্ঞানের চার আলোকবর্তিকা। প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, গণিত, দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, শরীর বিজ্ঞান , রসায়ন সহ -ইসলামী শরিয়াহ, ফিকাহ, আইন শাস্ত্র, ন্যায় বিচার ইত্যাদি জ্ঞান জগতের প্রতিটি শাখাকেই তারা আলোকিত করেছেন। ইমাম আবু হানিফার অন্যতম শিষ্য আবু ইউসুফ ছিলেন এক জীবন্ত জ্ঞান জ্যোতি। কিন্তু তার শৈশব ছিলো বেদনা-বিধুর । খুব শৈশবেই আবু ইউসুফ পিতাকে হারিয়ে এতিম হন। সন্তানকে নিয়ে মা নিতান্তই অসহায় হয়ে পড়লে শিশুপুত্র আবু ইউসুফকে তিনি কুফার বাজারে এক দর্জির দোকানে কাজে পাঠান। সীমিত আয়ে খুব কষ্টে অভাবী মায়ের সংসার চলে। কিছুদিন পর আবু ইউসুফের মা দেখেন – আবু ইউসুফের দৈনিক মজুরি দিন দিন কমে আসছে।
মালিক আবু ইউসুফের মাকে বলেন- মজুরিতো কম হবেই। আবু ইউসুফ কাজে ফাঁকি দেয়। দোকানে থাকেনা।
রাতে আবু ইউসুফ ঘরে ফিরলে মা জানতে চান- তুমি কাজে ফাঁকি দিয়ে প্রতিদিন কোথায় যাও?
পড়তে যাই মা।
কার কাছে?
ইমাম আবু হানিফার কাছে।
পড়ালেখার কথা শুনে- মায়ের মন খারাপ হয়। তিনি ছেলেকে বুঝিয়ে বলেন- বাবা পড়ালেখা করলে আমাদের না খেয়ে উপোস থাকতে হবে। গত দু দিন শুধু তোমার খাবার যোগাড় করেছি। তুমি কি চাও-তোমার মা না খেয়ে থাকুক। আজ পুরোদিন তুমি কাজ করবা।
আবু ইউসুফ মাথা নেড়ে কাজের উদ্দ্যেশে বের হয়।
সন্ধ্যায় আবু ইউসুফকে কাজ থেকে নিতে এসে মা দেখেন দর্জির দোকানে আবু ইউসুফ নেই। দোকানের মালিক আবু ইউসুফের মাকে ইমাম আবু হানিফার হালাকাটা দেখিয়ে দেন।
মা এসে দেখেন- ইমাম আবু হানিফার একেবারে পাশে বসেই আবু ইউসুফ গভীর মনোযোগের সাথে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ইমাম আবু হানিফার কাছ থেকে পাঠ নিচ্ছে।
রুষ্ট মা ইমাম আবু হানিফাকে বলেন- আবু ইউসুফ আমাদের আয়ের একমাত্র অবলম্বন। এখন সে যদি প্রতিদিন এখানে এসে বসে থাকে-তবে আমাদের আহার যোগাবে কে? আমি চাইনা আমার ছেলে এখানে এসে সময় কাটাক। ও যদি আসে- আপনার উচিত ওকে কাজে পাঠানো। আগেতো ক্ষুধার যন্ত্রনা নিবারণ । তারপর না হয় জ্ঞান অন্বেষণ।

ইমাম আবু হানিফা বলেন- মা-আপনি ওকে পড়ালেখা থেকে বঞ্চিত করবেন না। আমার মন বলছে- ও একদিন এতো বড় হবে-এতো সম্মানিত হবে বাগদাদের খলিফার সাথে বসে সে আলফালুদাজ আহার করবে। আলফালুদাজ হলো এমন একটা বিখ্যাত খাবার যেটা শুধু রাজা-বাদশাহরাই খেয়ে থাকেন। আর খাবার তো বড় কথা না মা। জ্ঞান যার দুনিয়া তার। মানুষ যত জ্ঞান আহরণ করে সে তত বেশী আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে।

মা আবু ইউসুফকে টেনে তোলে- দ্রতু গতিতে ঘর থেকে বের হতে হতে বলেন- রুটি খাওয়ার যাওয়ার সম্বল নেই। সে রাজার সাথে বসে আলফালুদাজ খাবে।

প্রিয় শিষ্যের বিদায়ে ইমাম আবু হানিফার রাতে ঘুম আসেনা। সারারাত বিছানায় ছটফট করেন। আবু ইউসুফতো সাধারণ কোনো ছাত্র নয়। একবার পড়লেই তার সব পড়া হয়ে যায়। একবার শুনলেই তার সব কিছু মুখস্থ হয়ে যায়। সুবেহ সাদিক হয়েছে। কেউ মসজিদে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছে। কেউ কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পর্ণকুটিরের ভাঙ্গা কাঠের দরজায়- মৃদু আঘাতের শব্দ শুনে আবু ইউসুফের মা জেগে ওঠেন। দেখেন- শিক্ষকের শিক্ষক, ইমামদের ইমাম, সমস্ত ফিকহবিদরা যার জ্ঞানের তুলনায় ছোট শিশু সেই আলোর দ্যুতি খ্যাত ইমাম আবু হানিফা আবু ইউসুফের জীর্ণ কুটিরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। মায়ের সাথে আবু হানিফার চুক্তি হয়। প্রতিদিন দৈনিক মজুরির ব্যবস্থা আবু হানিফা করবেন। বিনিময়ে আবু ইউসুফ দর্জির দোকানে কাজ বাদ দিয়ে শুধু পড়ালেখা করবে।

শুরু হয় ইমাম আবু হানিফার তত্তাবধানে শিশু আবু ইউসুফের জ্ঞান সমূদ্রে নিমজ্জনের পালা। একদিন মধ্যাহ্ন। আবু ইউসুফের শরীর খারাপ। নিদ্রাহীন রাতের জ্ঞান অন্বেষা তাকে একটু দূর্বল করে তোলেছে। আবু ইউসুফের শয্যা পাশে ইমাম আবু হানিফা। শরীর জ্বরে পুড়ছে। এক রাখাল ইমাম আবু হানিফার জন্য প্রতিদিন দুধ নিয়ে আসতো। সে এসে দেখে- হালকায় আবু হানিফা নেই। খোঁজ নিয়ে সে আবু ইউসুফের বাড়ি আসে। দুধের বাটি আবু ইউসুফের মাকে দিয়ে বলে- আজ থেকে আবু ইউসুফকেও আমি দুধ দিয়ে যাবো। ছেলেটা এতো পড়ালেখা করে। শরীরে একটু শক্তি না থাকলে কি হয়?
ভিতর থেকে মা বলেন- কিন্তু আমাদের তো ছেলের জন্য দুধ কেনার মতো কোনো অর্থ নাই।
দিতে হবেনা মা। আবু ইউসুফ যেদিন বাদশাহর সাথে বসে আলফালুদাজ খাবে- সেদিন আমার কথা স্মরণ করলেই আমি খুশী হবো।
আবু ইউসুফ বলেন- খলিফার সাথে বসে সেই খাবার আপনাকে ছাড়া আমি খাবোনা।

ইমাম আবু হানিফা মোনাজাত করেন। মা আল্লাহর কাছে অশ্রুপাত করেন। পাশে বসা রাখাল দোয়ার জন্য হাত তোলেন।
এই ঘটনার পর কেটে গেছে বহু বছর। কুফা, মসুল, বসরা, নজফ, কারবালা , বাগদাদের উপর কত সূর্য উদিত হয়েছে আর কত সূর্য অস্তমিত গেছে। আবু ইউসুফের জ্ঞানের দ্যুতিও ধীরে ধীরে অন্ধকার আকাশের উজ্জ্বল গ্যালাক্সি হয়েছে। সেই আলো ছড়িয়ে পড়ছে কুফা থেকে সমগ্র বাগদাদ পর্যন্ত।

বাগদাদের বাদশাহ তখন হারুনর রশীদ। আমিরুল মোমেনিন। বিশ্বাসীদের খলিফা। আবু ইউসুফকে তিনি ভালো করেই জানেন। রাজ্যের জন্য এমন একজন বিচারক তার খুবই দরকার। খলীফা হারুনর রশীদ আবু ইউসুফকে শুধু কাজী হিসাবে নিয়োগ দিলেন না- ইসলামের ইতিহাসে আবু ইউসুফের জন্য সর্বপ্রথম গ্রাণ্ড কাজি বা চীফ জাস্টিস যা বর্তমান সময়ের সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারক সমতুল্য পদটি তৈরি করেন।
প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে খলিফা খেতে বসেছেন। আবু ইউসুফের অশ্রুসজল চোখ।
খলিফা হতবাক।
আবু ইউসফু বলেন-প্রচন্ড জ্বরে যখন শরীর পুড়ছিলো- যখন এক বাটি দুধ পান করার মতো সামর্থ্য ছিলোনা- তখন ইমাম আবু হানিফা মোনাজাত করে বলেছিলেন- বাগদাদের খলিফার সাথে বসে একদিন আমি আলফালুদাজ খাবো। মা সেই দোয়ায় শরীক হয়েছিলেন। রাখাল ভাইটি কেঁদেছিলেন। খলিফার সাথে আজ খেতে বসে আর অশ্রু সংবরণ করতে পারলাম না।

খলিফা বলেন- ইমাম আবু হানিফা এমন কথা বলতে পেরেছিলেন- কারণ তিনি আপনাকে চোখ দিয়ে দেখেন নি। অন্তর দৃষ্টি দিয়ে দেখেছিলেন। ইমাম আবু হানিফার মতো শিক্ষক পেয়েছিলেন বলেই আজ আমরা আপনার মতো বিচারপতি পেয়েছি। আবু ইউসুফের প্লেটে খাবার তোলে দিয়ে খলিফা বলেন – এবার খাবার শুরু করুন।
সেটাতো সম্ভব না। জ্বরের শরীরে দুধের রাখালের সাথে আমার ওয়াদা ছিলো- উনাকে ছাড়া আমি খলীফার সাথে বসে আলফালুদাজ খাবোনা। আগে গিয়ে দেখি উনি বেঁচে আছেন কিনা। যদি বেঁচে থাকেন তবে সাথে করে নিয়ে আসবো। আর যদি ইন্তেকাল করেন- উনার কবরে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিবো। আবু ইউসুফ বাগদাদ থেকে রাখালের খোঁজে কুফার পথে বের হন।

খলিফা অবাক চোখে আবু ইউসুফের দিকে চেয়ে আছেন। একজন রাখালকে দেয়া ওয়াদার কথা যিনি ভুলে যান না- তিনিতো কোনো মানুষকে তার প্রাপ্য ন্যায় বিচার থেকে বন্চিত করতে পারেন না। খলিফা বলেন- আমি আবু ইউসুফকে চিনতে ভুল করিনি। আমি বিচারক বাছাই করতে ভুল করিনি। যে ওয়াদা পালন করে- তাকেইতো আল্লাহ পৃথিবীতে এবং আখিরাতে সম্মানিত করেন।

আজ আমরা বুঝে না বুঝে কত ওয়াদা করি। রাস্তা দিবো, ব্রীজ দিবো, সড়ক দিবো, ন্যায় বিচার দিবো, মানুষকে জীবনের নিরাপত্তা দিবো। ছোট, বড় আমাদের কত রকমের ওয়াদা। আমাদের ওয়াদা করারও শেষ নেই, ওয়াদা ভাঙ্গারও শেষ নেই। অথচ, একজন রাখালের সাথে করা ওয়াদা পালনের জন্য দেশের প্রধান বিচারপতি কুফার পথে হেঁটেছিলেন। ইসলামকে মহিমান্বিত করা সেই মানুষগুলো আর নেই। মহাকালের অনন্ত যাত্রায় সেই জগৎজ্যোতি জাস্ট আর ট্রাস্টরা চলে গেছে। শুধু ডাস্ট আর রাস্টরাই আজ রয়ে গেছে।

সোর্সঃ https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=10158910670538205&id=781738204

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here